Tuesday, 30 December 2025
আরাবল্লী বাঁচাও: কিছু প্রাসঙ্গিক কথা (১)
Binay Krishna Pal / বিনয় কৃষ্ণ পাল
.
ঘটনাক্রম:
২০ নভেম্বর: সুপ্রিম কোর্ট আরাবল্লী পর্বতমালা সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত রায় প্রদান করে।
১১ ডিসেম্বর: আন্তর্জাতিক পর্বত দিবসে এই রায়ের আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করে 'আরাবল্লী বাঁচাও' আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।
আন্দোলনের বিস্তার: ক্রমশ এই আন্দোলন দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ ওঠে যে, সরকার ও বিচারব্যবস্থা পরিবেশ রক্ষার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
২৭ ডিসেম্বর: জনবিক্ষোভ ও বিতর্কের মুখে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (Suo Motu) তাদের আগের রায়টি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়।
আরাবল্লীর গুরুত্ব: ভারতের প্রাকৃতিক প্রাচীর
আরাবল্লী পর্বতমালা উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক অপরিহার্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। এটি থর মরুভূমির পূর্ব প্রান্তে একটি প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়ে থেকে শুষ্ক ও উত্তপ্ত বালুকাময় বাতাসকে গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এর ফলে মরুভূমির বিস্তার রোধ হয় এবং পূর্বদিকের রাজ্যগুলোর জলবায়ু তুলনামূলক আর্দ্র থাকে। এছাড়াও, আরাবল্লী গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ুকে বাধা দিয়ে রাজস্থান ও গুজরাট অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে। বহু নদীর উৎসস্থল এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার এই পর্বতমালা ভারতের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে আরাবল্লী নানা মূল্যবান খনিজ ও শিলা সমৃদ্ধ, বিভিন্ন বাজারে যার বিপুল চাহিদা রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষা: উৎস বনাম চাহিদা
পরিবেশ রক্ষার দুটি প্রধান দিক রয়েছে—সমস্যার উৎস (Supply) নিয়ন্ত্রণ এবং চাহিদা (Demand) নিয়ন্ত্রণ। পরিবেশচিন্তাবিদদের মতে, একটি নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র বা সরকারই পরিবেশ রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে।
১. উৎস নিয়ন্ত্রণ: পরিবেশের ক্ষতি করে এমন উপাদানের উৎস বা জোগান নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে প্রশাসনিক কাঠামোর হাতে।
২. চাহিদা নিয়ন্ত্রণ: এটি মূলত সাধারণ মানুষের ভোগবিলাসের ওপর নির্ভর করে।
তবে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জোগান অব্যাহত রেখে কেবল মানুষের সচেতনতার ওপর ভরসা করে চাহিদা কমানো কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, বাজারে প্লাস্টিকের ব্যবহারের কথা বলা যায়। প্রশাসন সচেতনতামূলক প্রচার চালালেও সুবিধার কারণে মানুষ ক্ষতিকর জেনেও প্লাস্টিক ব্যবহার করে। কিন্তু যদি প্লাস্টিকের উৎপাদন বা উৎস মুখেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তবেই এর ব্যবহার সামগ্রিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব।
পাবলিক ট্রাস্ট ডকট্রিন ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
সাধারণ মানুষের ভোগবাদী মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নীতির ওপর নির্ভর করে। তাই পরিবেশ রক্ষায় বিশেষজ্ঞ, সমাজকর্মী এবং নীতিনির্ধারকদের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। 'পাবলিক ট্রাস্ট ডকট্রিন' (Public Trust Doctrine) অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন—বন, পাহাড়, নদী) জনসাধারণের সম্পদ। সরকার এখানে কেবল একজন 'তত্ত্বাবধায়ক' বা 'অছি' (Trustee) হিসেবে কাজ করবে। ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক লাভের জন্য এই সম্পদ হস্তান্তর বা ধ্বংস করার অধিকার সরকারের নেই।
*
২০ নভেম্বরের রায়ের পর থেকেই পরিবেশকর্মী ও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। যদিও বিচারপতি গাভাই দাবি করেছিলেন যে, এই রায়ের ফলে আরাবল্লী আরও সুরক্ষিত হবে, কিন্তু জনমানসে তৈরি হওয়া ক্ষোভ সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ব্যাপক বিতর্কের মুখে সুপ্রিম কোর্ট এখন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রায়টি পুনর্বিবেচনা করছে। এখন দেখার বিষয়, দেশজোড়া এই আন্দোলনের চাপে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকার 'পাবলিক ট্রাস্ট ডকট্রিন' মেনে আরাবল্লীর মতো অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে কতটা বলিষ্ঠ ভূমিকা নেয়।
Subscribe to:
Comments (Atom)